সমূহ নির্মাণের আগে
ভাঙ্গো, কুমোর যেভাবে ভুল প্রতিমা ভাঙ্গে
নির্ভুল নির্মাণের আগে ভেঙ্গে ফেল প্রসিদ্ধ পুরাণ
কবি ব্যর্থ পঙক্তিমালা ভেঙ্গে দেন অক্ষরে অক্ষরে;
নদী ভাঙ্গে পাড়,
নিজস্ব নিয়তি মুখ সমূহ বাঁক নিযে যেভাবে ঘোরে
ভেঙ্গে পড়ে মেঘ নীলিমা চূড়োয়
অবরুদ্ধ আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টির ধারাপাতে।
ঝড় যেভাবে ভাঙ্গে স্থবির লোকালয়
বিদ্রোহ বিন্যাস ভাঙ্গে প্রবুদ্ধ প্রতিন্যাসে।
ভাঙ্গো, শিশু যেমন ভেঙ্গে আসে আলোহীন ঘরবাড়ি
জন্মের বিশিষ্ট চীৎকারে!
তোমার অকূল জলে ঈশ্বর
তোমার অকূল জলে ঈশ্বর কি সাহসে ভাসে হাঁসপাইনা ভেবে তার তল
বালিকার চেলে দেয়া ঘুঁটির মত
প্রান্তরে দিয়েছ ঢেলে কিছু মেষ, যুথচারী ষাঁড়
তারা কি প্রতিজ্ঞায় উঠে দাঁড়ায়, মুখ রাখে ঘাসে
উত্তর আকাশ হতে ভয়ার্ত মেঘের দল হামাগুড়ি দিয়ে ফেরে
দক্ষিণ আকাশে
কি স্পর্ধায় হঠাৎ সে জলরাশি বৃষ্টির বর্শা তুলে
ধেয়ে আসে নিরস্ত্র ডাঙায়, নিম্নভূমির বাহু বিঁধে জলে।
কি সাহসে বনঘুঘু রাখে তার পলকা পালক ঠাসা ডানা
অসীম শূন্যতায়-
রাখে আর উড়ে যায় ছন্দোময় সুদূরের নীলে।
কি নিয়মে বালিকা কিশোরী হয়, স্পর্ধিত বেড়ে হয় নারী।
তোমার অভিশপ্ত এই দেশ পড়ে পড়ে মার খায়, জ্বরতপ্ত ধুঁকে
কি সাহসে হঠাৎ গর্জে ওঠে, ছিঁড়ে ফুঁড়ে ফেলে শৃঙ্খল
উল্টায় সনাতন সাজ, মসনদে বইয়ে দেয় নদী,
বুঝিনা ঈশ্বর!
নগর দ্রৌপদী
ঝোপের আড়ালে দ্রুত সেরে নেয় প্রসাধনবিদায়ী আলোর ভোজে কী আহার্য এগুনো আঁধারে
পায়ে পায়ে বেঁধে আনে তন্দ্রারহিত রাত
অভুক্ত দিনের গ্লানি পাঁজরে পঙক্তিময়,
বিশীর্ণ শরীরে বিকীর্ণ স্তনফুল ঝুলে পড়ে
আসে ক্লান্ত তন্দ্রাজড়িত ভোর, ঘাসে ছড়ানো ডিভানে।
পাখা ঝটপট দ্রুত নত হয় মোরগের সঙ্গমে
ঝোপে বা পৃথিবীর পতিত প্রান্তরে, আহত মাটির মত
বিস্বাদিত, বিলম্বে তার ঘৃণা
সে এনেছে ভণিতা-বিহীন দেহ পৃথিবীর পণ্যের রীতি জেনে
অধিক বিপন্ন আর মানবিক তার ক্ষুধা।
কাঁদাজলে পদচ্ছাপ বাঘের অন্ধকারে লুকানো অবয়বে
সরীসৃপ হেঁটে যায় উচ্ছিষ্ট মিনারে
কিংবা এক গিরগিটি গেল খুঁড়ে
সবুজের অধিক সবুজ ঋতুর ভেতরে লালজবা
স্বেদে ও সম্ভবে বৃষ্টি আর কুয়াশার নীচে
নিয়নের সতিনী সখ্যতা।
যখন ঘুমায় পাপ, মরুসাপ নগরের প্রখ্যাত নারীরা
পরাগ বিছানো অলৌকিক বেহেস্তের ঘরে
জেগে থাকে ধ্রুপদসম্ভব জনপদের দ্রৌপদী।
আলো ও ঈশ্বরের দৌড়
অন্তহীন মহাজাগতিক ব্যাস ঈশ্বরের ছায়া
বিস্তারের হাত ধরে যাচ্ছে মানে আলোর দৌড়, পরিব্যপ্ত চতুর্বিস্তার।
চতুর্বিস্তার বলা মিতভাষণ, ৩৬০ ডিগ্রীর প্রতিটি উলম্ফ বেয়েই একগুচ্ছ তীর
মহাজাগতিক পরিধির দিকে সন্তরণমান, বস্তুত পরিধিবিহীন, ওরাই আলোহাঁস তীক্ষ্ম
শিঙঅলা মায়াবী হরিণ, ক্ষীপ্র ঝাঁপে নির্মাণ করেছে পরিধি; আর জলও নেই যে
সাঁতার সম্ভব, বিস্তৃতির মধ্যে আপন সাঁতারের জল তৈরী হচ্ছে, দৌড়–বার সবুজ
পাতাময় মাঠ; মানে শয়তান ও ঈশ্বরের পারস্পরিক ঈর্ষার জায়গা। ক্রমশুদ্ধশীল
ফেরেশতাদের আলখাল্লা শুদ্ধতার অপার অহঙ্কারে স্ফীতমান আর বেহেশতের হুরদের
লীলাস্রস্ত পোষাক-আষাক মহাজাগতিক জলে ভাসছে। বিস্ময়কর সে দৌড় এখনো থামেনি,
কখন থামবে বলা অসম্ভব, কারণ থামলেই ঘড়ি অচল। বালুকণারও তুচ্ছ এই পৃথিবীর
ভেতরে আমরা যে প্রতিশ্রুতিপূর্ণ অথচ অসভ্য সভ্যতা গড়ে তুলেছি তাও অচল। তবে
আমাদের আত্মহননের উন্মাদনাও চাপা পে যাবে। তখন কে খাবে ঐ আণবিক নৈশখাদ্য?
সংযোজনা ও ভাঙ্গচুর
এ ফুলটি নিচ্ছি এখন অন্য ওটি থাক,এ দুটি বীজ বুনবো শুধু
যত্ম-রৌদ্র, আত্তি-বৃষ্টি সবই পাবে এ দুটো বীজ
আরগুলো সব খরায় শুকোক বা বৃষ্টিতে উঠুক ঢাউস ফুলে।
এ তিনটি জমি নিচ্ছি, সতর্কতার নিখুঁত বেড়ায় ঘিরবো শুধু তিনটি জমি
পলির প্রতি প্রগাঢ়পাত, এখন আমি ঢেউ বিমুখ, জল ছোঁব না
সবুজ ভাল, এখন আমি সবুজ নিচ্ছি, নীল ছোঁব না
সমুদ্র এক নীলচোখা দেও, নীল আকাশের নীল ছেনালী ভাল্লাগে না।
থাকব কখন কোন বিজনে এ কোলাহল থেকে অনেক দূরে
ঘর-গেরস্থে মন টানে না, এখন আমি বাড়ি-কুঠুরি বিমুখ
পাহাড় ভাল, পাহাড় নিচ্ছি, বিশেষ কেবল এ পাহাড়টা
আরগুলো সব আকাশ ফুডুক কিংবা মিশুক নদীর বুকে
আমি নিচ্ছি এ পাহাড়টা, বিশেষ কেবল এ পাহাড়টা…
বিভ্রান্ত বালকও ঘুরেছে
দু’জন বৌদ্ধনারী ভোরবেলা মিহিতন্তু রোদের বাকলেসুঠাম জড়িয়ে নিয়ে আরো তন্তু হাওয়ার শরীরে
চিকন প্রখরাবতী কার্ভ নিয়ে সোমত্ব ঘুরেছে
অনিদ্র পোষাকের ভ্রমে লালচক্ষু কোমলাভ জ্বেলে-
ভেতরে প্লুটোর আলো, অবশিষ্ট ঝুড়িতে রেখেছে
ব্যগ্র বাড়িয়ে দেয়া শিষ্ট গোলকে, র্যাডিয়াল
ঘড়ির দোলন, এরা কি প্রবর্তনা জুড়ে দেয়
বহুদরী কস্তুরীর মত সুগন্ধে ভরপুর।
প্যারাবোলা, ঐসব মৃতগন্ধী মগজ সারস
একবার উড়ে গেলে সহসা ফেরেনা, বরঞ্চ দূরত্ব
আত্মায় বেধে পরাগের অতিথি পাখিরা
ঠোঁটে ঠোঁটে, এদের বাঁকানো ভঙ্গীর নীচে পরাহত।
উৎসুক বালকও বিভোর, বুদ্ধের ধ্যানমৌন
প্রস্তরের কাছে ওদের প্রার্থনার ভাষা অস্ফুট শুনেছে
সেই থেকে পিছু, মুগ্ধতন্তু সেই থেকে ছোটে
অবাক নদীর দেহ নারীদের জ্যামিতিক ছকে।
মনে হবে প্রলোভিত, মনে হবে ওদের বাহন
আর যে অবাক তেজ তার দীপ্তি জেনে
প্যাগোডার খিলানের নীচে পিঠেপিঠি দুই বোন,
সহসা ঘুরে বলে, ‘কেন এত পিছু পিছু ঘোর’?
লেখো মিতভাষণ, শিষ্টাচার লেখো
আমাকে হারিয়ে দেয় আমার সন্তাপমৃত্যুচিহ্ন বুকে তুলে আনে
বলে লেখো মিতভাষণ, শিষ্টাচার লেখো
যা-ই লেখো হবে হিজিবিজি।
যে আরাধ্য প্রতিমা প্রতিম ভেবে অসুখ করেছে
সাদামাটা পুড়ে গেল প্রয়াত চিতায়
অত্যুজ্জ্বল জ্বলে ওঠে চিতার শরীরে
বহুল মীমাংসা শেষে বলে, চিতাভস্ম রাখো,
কিংবা মেখে নাও শৌর্যচূড়ায়, শীর্ষপতন হতে
বিজয়ীয় দেহ ভেসে থাকে আপাদমস্তক
অগৌরবে জীবনে বুঝেছে, সাদা পাখা
মৃত্যুর ছাড়পত্র তাকেও ছেড়েছে।
অপমৃত্যু তিলকে পরায়, অপভ্রংশ পোড়ায় শরীরে
রজতজয়ন্তী ভরে ভুলশব্দে রাত্রির পিঠকে ভরেছ
বলে, লেখো দৈন্যদিন, হাভাতে রাত্রি লেখো
যা-ই লেখো হবে হিজিবিজি।
যুদ্ধ আয়োজন
কাল যাব, কাল শিশুটির হাসি দেখা যাবেবুকের নিবিষ্ট কাছে পাব স্নেহলতা,
আজ যাচ্ছি পাহাড়ের পিঠে পিঠে চড়ে-
পাহাড় রেখেছে জল হাঁটু ডোবাবার,
কিংবা তার দৈত্যমান কালো বুকে ঠেসে
রঙিন কোর্তাখানি লম্ফমান গেরুয়া করে নেবে।
কাল যাব, কাল নদীটির ব্রীজ দেখা যাবে,
জলের সারাংশধ্বনি, সীমাবদ্ধ কোমর পেঁচিয়ে
নুয়ে পড়া কাঠামো সুঠাম, ব্যঙ্গ আর বহুভঙ্গতল
এপাড়কে ওপাড় করে, উৎসমূখে আজ যাচ্ছি-
উৎসাপাড়ে গ্রামে গ্রামে আজ এক যুদ্ধ আয়োজন।
সে যুদ্ধ সমাপ্ত করে রাশি হাসি তুলে দেবো
ব্রিজের ইস্পাত ঠোঁটে, শিশুদের রঙিন কোর্তায়।
উড়ন্ত ধূলিগ্রামে
এক.এই স্নায়ুর সংকটের পর অতিদ্রুত ডানা মেলে যাই
ঐ পরম অভীপ্সা সকাশে, গ্রাম থেকে প্রথমতঃ
গন্ধরতি পাই আর উড়াই সহস্রজ্যেতি নির্ণিমেষ
চেয়ে থাকা গ্রাম্যভূত কী করে তাড়াই, তাদের
বস্ত্রহীনা, শীর্ণকায়া গাঁয়ের ভেতর থেকে এসে
মিশে থাকে গায়ে, যোজনগন্ধার সরাতে পারি না।
উড়ন্ত সমস্ত মুখ স্থানুর চিত্র শুধু নয়,
বৃত্তান্ত সকলে জানে, গল্প কারো কিছু কম নয়।
সমস্ত গ্রামেই স্বরগ্রাম গন্ধপচা শহরের প্রেত-
আচ্ছন্ন ঘুমের পাশে দুধসাদা জ্যোৎস্না নদীতীর
উথল দুধের দৃশ্য অবারিত জানালার ভিড়ে
উপচানো দুধবাহী মায়েদের ঘিরে তৃপ্ত শিশুরাত…
দুই.
না থামা স্নানের শেষে এই ধূলিগ্রামে ঢুকে পড়েছ
শূদ্রদের প্রাণের ভেতর প্রাণভোমরাকে পাখাসঞ্চারী করে-
বহুজাতিক সাবানের মোলায়েম ফেনার শয্যায়,
ফেননিভ পরীদের ত্বক নিযে এসে গেছ নমঃপ্রতিবেশে।
দেশজ আঁশের আশপাখাখানি উড়ন্ত ছায়াগ্রামে
ধূলির অতিউচ্ছ্বাসেরও ঘষে গেল হাতখানি
মলিন ছায়াপথে…
ঈশ্বরের মুখ
এক সন্ধ্যায় তোমার সাথে দেখা হলো ঈশ্বর!
সমগ্র আকাশ জুড়ে সে কী উদ্ভাসন, সে কী স্বপ্নশুভ্রনীল! সমগ্র আকাশ জুড়ে সে
কী উদ্ভাসন, সে কী স্বপ্নশুভ্রনীল! ময়ূরের পালকও এত সুন্দর নয়; কী নাম দিই
সেই সুন্দরের, ভেবে ভেবে তোমারই নাম মনে এল।
সন্ধ্যা তখন রাত্রির বুকে বিলীন হচ্ছে, এত
স্তব্ধ অরণ্যানীর পাশ দিয়ে ছুটছিল আমাদের পেখমতোলা গাড়ি, খুব অল্প আলোর
ভেতর বৃক্ষদের ঐ রকম সংবদ্ধতা ঐরকম ভীত পিছু দৌড়, শীর্ষজুড়ে কত যে রহস্যের
পর্দা নেমেছিল। সেই পরিব্যপ্ত রহস্যময়তার বুক চিরে তোমাকে দেখলাম; আমি কি
ভুল দেখেছি?
আজ সমস্ত সৌন্দর্যের পাশে চোখে পড়ে, উঁকি
দিয়ে যাও। বহুকাল তোমাকে পাইনি দেখতে, পোড়া চোখে কি আন্ধার ঠুলি! এখন
প্রতিটি দৃশ্যের পাশে বাকহীন স্তব্ধ বিস্মিত থাকি পাখি, আর ডাকি তব নাম,
মন্ত্রমুগ্ধ অনির্ণেয় তোমারই অবয়ব ভাবে চোখে।
*
সোর্সঃ কীর্তিকলাপ ওয়েবম্যাগ