অনুসন্ধান..

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০১৫

কচি রেজার গুচ্ছকবিতা


এই যে মুখ, এ কিন্তু আমার নয়, আমার বিষাদ আমি ফেলে এসেছি পেছনে। দুর্ঘটনায় সব রক্ত বেগুনি হয়ে গিয়েছিল, আমার অতীত বেগুনি হয়ে গিয়েছে। এখন মুখ অথবা বিষাদের কথা ভাবি না, ফিরতে পারি না অতীতেও, দেহ তবু ধরে রেখেছে দাগ। দাগ আছে বলে দেহ আর্তনাদ করে, আর্তনাদের সুরও চিনতে পারি না। এখন এই যে আমি জল নই, দৃশ্য নই, কী দিয়ে ভোলাবে? আমি তো আমার বিষাদ মুছতে পারিনি, গোপন করতে পারিনি বর্ণহীনতা। সাপ বেরিয়ে আসে রাতে আমার ঘুমন্ত নিঃশ্বাস থেকে, পৃথিবীর বাজারে কেঁপে ওঠে চাঁদ সদাগরের বেদনা। মৃত্যু বাড়ে, একে একে ডুবে যায় সপ্তডিঙা। সনকার কান্নায় আমার জেগে থাকা কেঁপে ওঠে, কেঁপে ওঠে নিদ্রা। একটু পরেই সিঁথি থেকে সিঁদুর মোছা হবে, পায়ের আলতা ফিরে যাবে শিশিতে। অহংকার হেরে গেছে, মনসার বাড়িতে আজ তাই সাপনৃত্য, সাত লহরী আঁধার পরে নাচ হবে সারারাত। আমি মহাভারত থেকে পালিয়ে আসি আবার মহাভারতে জন্মাব বলে।

১০ বৈশাখ ১৪১৫
২৩ এপ্রিল ২০০৮



সংসারের নিয়মে আমি এখন জুতোর বাক্সে ঘুমাই, জুতোর বাক্সে ঘুমাতে আমার ভালো লাগে না। তখন পুতুলগুলোর কথা মনে পড়ে। পুতুলগুলোও রাতে জুতোর বাক্সে ঘুমাতো। মাঝে মাঝে বিছানায় আমার কাছে নিয়ে আসতাম। দেখতাম পুতুলগুলোর হাসিমুখ! পুতুলগুলো একদিন এক বাক্স থেকে আর এক বাক্সে স্থানান্তরিত হয়েছিল, সেদিন ওদের কান্না কিন্তু আমি শুনেছি। অথচ হঠাৎ একদিন বিসর্জনের বাঁশি বেজে উঠলে আমার মায়ের ভারী আঁচলে রুপোর চাবি দুলে ওঠে- মণ্ডপের ছায়ায় হঠাৎ নিভে যায় চার পাঁচ হাজার নীল বাতি। প্রতিমার অসহায় কান্না কেউ শুনতে পায়নি সেদিন। আমিও পাইনি, বরং কাঁধে আঁচল ঘুরাতে শিখেছিলাম। অনেক প্রস্তুতির পর কিশোরী মাথার চুলে খোঁপা বাঁধতে শিখেছিলাম, আমিও সেদিন সেজেছিলাম মিথ্যে মা। আসলে সব মা-ই মিথ্যে!

পুতুলগুলো খুঁজে পাইনি। দুর্ঘটনায় জ্যোৎস্না-হারানো হরিণ কিন্তু ছুটছে, শানের সিঁড়িতে সড়সড়ি খেলে প্যান্ট-ছেঁড়া শৈশব প্রতিবন্ধী চাঁদের মতো ডুবে গেছে। পুতুলের কান্না কিন্তু আমি আজও শুনি। নতুন শাড়ি, ব্রোকেড ব্লাউজ, নতুন খোঁপা বাঁধতে কষ্টই করতে হয় না আর! পুতুলগুলো কি মরে গেছে! জানি, মানুষই তো মরে! আর জানি আমার মা জানে না আজও, পুতুলগুলো আমার বুকে ঘুমাতে ভালোবাসতো।

আজ যখন একটি হাত আমার ঘুমন্ত মুখ হাতড়ায়, চুল বেঁধেছি কি-না, চোখ ভিজে কি-না, তখন কবরের শেষ কটা বাতিও নিভে যায়। দম আটকে মা যখন বলে, খেলবি? পুতুল বানিয়ে দেব আবার! আমার ছেঁড়া কাপড়ের পুতুল কি এত কেঁদেছিল সেদিন, আমার মায়ের ভাঙা পুতুলের মতো?

১৩ শ্রাবণ ১৪১৫
২৮ জুলাই ২০০৮



তোমার নির্দেশে এখন আমার শীতকাল, তাই তো বাড়িয়ে দেয়া জলেরও এখন বরফ-সময়। পরাহত হাতের কষ্টে জলসাঁতারও কাটি না। অথচ সারসের জলসাঁতারের বাড়াবাড়ি যোগ্যতা আমি জানি। আমি তো জানি, নিয়তির বাম হাতে আমার কপাল ভাঙে। চোখের জল চেপে আমি নক্ষত্রের ঘরে বাস করি। এ জীবনে যত সারস দেখেছি, তোমার ইশারার অপেক্ষায় তারা। আমার পরকাল নেই, আমি সারস অপেক্ষাও অযোগ্য। সমুদ্রতীরে যত বালুর প্রপাত সবই কিন্তু নক্ষত্রপতন, নক্ষত্রের ইশারায় কত ডানাই তো খসে গেল! তোমার বাড়িয়ে দেয়া জল সরিয়ে সারসের উড়াল দেখা যায় আর ডানার ব্যথা নিয়ে ডালপালার ছায়া বাঁচিয়ে আমি বৃক্ষের নিচে বাস করি।

এত ঘটা করে আমাকে পরাজয়-দৃশ্যে নামানোর কী দরকার? আমি কি আর স্বর্গে যাব? এই ক্ষুধার হাত-পা নিয়ে কতবার পিছলে পড়ি, দাঁড়াই ফুলগাছের পাশে। ফুলের এমন ব্যাপার যে ছিঁড়তে পারি না এই পাপ হাতে। ফুলেরও পরকালে বিশ্বাস, তাই ফুল না ছুঁয়ে ভাবি- আমার যৎকিঞ্চিৎ দেনা তো শোধ হল।

৭ আশ্বিন ১৪১৫
২৪ সেপ্টেম্বর ২০০৮



যে আশ্চর্য চিহ্নে নিজের কপাল সাজিয়েছ তা দেখে মহাকাল কেঁপে ওঠে। কপালে কি পাথর মানায়? পাথরের যুগেও আমি পাথর হতে দেখিনি কোনো রক্ত-মাংস। তুমি কি শুনতে পাওনি বোমারু বিমানের শব্দ? তোমার বিস্ময়ের কপালে আদৌ পৌঁছায়নি আমার হাত! কোনো মর্ম শোনায়নি জগৎ? সময়কে বেঁধে রেখে জগৎ অনেক গল্পই তো করে, আমিও জখম মন নিয়ে শুনি যতক্ষণ না ভারী হয়ে ওঠে কাঁধ। এই কাঁধে চড়েই সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিল সিনবাদ। সিনবাদের পা আঁকড়ে ধরে আছে সময়ের কাঁধ। আমি তো নিঃশব্দে গ্রহণের গল্পগুলো শুনি, যাতে সূর্যের মুখ ঘুরে যায় বেদনার দিকে। আজ যখন শূন্য শতাব্দীর ভূখণ্ডে সবার বিধ্বস্ত হাত একত্র, একটানে ছিঁড়ে ফেলেছ গলার ধান তাবিজ? জান না এই তাবিজেই বাঁধা জগতের অবজ্ঞার গল্পগুলো? তোমারও কি ঈশ্বরের মতো সর্বনাশ আর পাথরেই পক্ষপাত? ঈশ্বরের কিন্তু পূর্বপুরুষ নেই, উত্তরপুরুষও নেই।

২৪ ভাদ্র ১৪১৫
৮ সেপ্টেম্বর ২০০৮



মাটি তার আত্মজীবনী নিজেই লেখে বলে মাটির ঘরে কোনো মিথ্যে কলম নেই। জন্মেরও বাড়াবাড়ি নেই। এতটাই আত্মবিশ্বাসী মাটিকে তাই একচুলও মিথ্যার দিকে নিতে পারি না। আমরা ঠিকানা হারিয়ে বিপদের ঘরগুলো কেটে দিয়েছি। এখন হাঁটছি ভাড়া করা পথে। ভাড়া করা পথের নিঃশ্বাসের কি নিজস্ব অক্সিজেন থাকে? কত আশঙ্কা নিয়ে ভোর হয়, প্রায়ই সারসগুলো ঠিকানা খুঁজতে গিয়ে সংঘ হারিয়ে ফেলে। বুদ্ধের বাণীর মতো সারারাত বরফ পড়ে পড়ে ঘুমগুলো জমে যায়। এভাবে হেঁটে কতক্ষণে নৈঋতে পৌঁছুব? বিষুবের ওপর দাঁড়িয়ে দেখব পৃথিবীর মুখ? পৃথিবীর বৃক্ষগুলো ভালো নেই, মানুষের অনিদ্রা সংক্রমিত করেছে বৃক্ষের মিহিন ধর্ম।

ভূগোল হারানো প্রাণ আমাদেরও, ভূগোলের মেয়েটি সবুজ টিপ পরে। আমরা কি সবুজ মেয়েটিকে আর খুঁজে পাব? বেদধর্মের কোন মন্ত্র শেখাব তাকে? আমরা পরাজিত মানুষ, নিজস্ব নিঃশ্বাস নেই তবু বিপদের পোতাশ্রয়ে যে যুদ্ধাস্ত্র তাক করা সবই কিন্তু আমাদের দিকে। এভাবে আমরা যে অন্তিম ঘরে পৌঁছে যাই, সে ঘর কি ভাড়া হয়? আর যদি নাই জন্মাই কেন এত কাঁদলাম?

৬ আশ্বিন ১৪১৫
২২ সেপ্টেম্বর ২০০৮



বদলে যাবে বিকেল আর লাল বাতাস পুড়িয়ে চলে যাবে; তীরবিদ্ধ সময়ের তো লাল হবারই কথা। সময়ের হরিণের গায়ে নীল নীল ছোপ, মুখ থেকে ফিরিয়ে নিয়েছে মুখ তবু দেখো উন্মাদের অভিশাপে এক স্তব্ধ সূর্যোদয় কিন্তু আমার দেখা হল না। ডুবে মরতে চেয়েছি যে জলাশয়ে তার গানের রক্তে আমার আলিঙ্গনও বাকি। তবু পুড়িয়ে চলে যাবে বাতাস আর উপত্যকার মেঘ উড়ে গিয়ে জমা হবে শরতে। কতদূর থেকে ভূখণ্ডের হরিণ এঁকে নিয়ে এসেছ তুমি, দূরের ধুলো তোমার মুখের গন্ধে ওড়ে। যে হরিণের চোখে সময়ের অবিশ্বাস তার পায়ে বেড়ালের নূপুর। এখন বেড়ালের যুগ। ছাপচিত্রে যে আগুন সে-তো জল কেটে এগুনো দাসজাহাজের গান আর বৃন্দনাচের রক্ত পুড়িয়েছে যে পাথরের দেয়াল সে আমার জন্মোৎসবে আদিবাসী গোত্র নাচ। আমার রূঢ় মায়ের শুদ্ধতা। এখন সময় বদলে গেছে আর লাল বাতাস পুড়িয়ে চলে যাবে।

১৪ ভাদ্র ১৪১৫
২৯ আগস্ট ২০০৮



তোমাকে বুঝি না বলে কত প্রতিশব্দ তৈরি হয়, আমার পায়ের ভুলগুলো কিন্তু আমি বুঝি। যখন জোনাকির পেছনে ছুটতাম- অন্ধকার চিনেছিলাম। আজ নৌকার গায়ে যে জোনাকি সে সংকেতবাহী আগুন তুমি চিনতে পার তো? নদী একা আসেনি, সঙ্গে রাজহাঁসের গ্রীবাও। আমরা অস্বীকার করি লৌকিক অথচ গ্রীবার কারুকাজ বিভাজন এঁকে দেয় লৌকিকতার কপালে। একদিন এক বৃক্ষকে কথা বলতে শুনি, বুকে কান পাতলে কিন্তু কাঠের কান্নাও শোনা যায়। অশ্রু কি ভুলে যাওয়া শব্দ? যখন বিস্মরণ লিখে পাতাগুলো ঝরে ঝরে পড়ে, তখন ভুল আর ভুলে যাওয়া বিপরীতের অঙ্ক করি আমি! মীমাংসা হয়নি সমীকরণেও। তোমার প্রশ্নগুলো পরপর প্রতিশব্দ তৈরি করে বলে মনে হয় সরল অঙ্ক, কিন্তু অমীমাংসিত থাকে। সম্ভবত তুমি তৃপ্ত হবে না তবু আমি সূত্র আবিষ্কার করি এভাবে। এক অসহায় সংহতি বাজিকরের মতো স্পর্শ রাখে পুরো সময়ের কপালে।

১৭ ভাদ্র ১৪১৫
১ সেপ্টেম্বর ২০০৮



আমার মন খারাপ কি কদম গাছের চেয়েও বেশি, নিজের কাঁটা ভরা পা কী বলে? রাজার নির্দেশে যে যজ্ঞ জ্বলে উঠেছে তাতে কি আমার রক্তাক্ত পাও পুড়ে যাবে? এখন তো পায়ে পায়ে আগুনের দায়, কই আমার দেহ তো জ্বলে উঠল না! তুমিও এমন দূরের রোদ্দুর। বর্ষায় ভিজতে চাইলেও কদম ফুলের অপেক্ষা করি। কারণ ফুলের তীব্র সন্দেহের কথা আমি জানি, ফুলের কাছে আমি অপরাধী হতে চাই না, ফুলের ছোটো ছোটো পাও আমি মাড়িয়ে দিতে চাই না। পৃথিবীর প্রথম সীতা হরণের কথা জেনেছিল অগ্নি। অগ্নিও কিন্তু পোড়াতে পারেনি সীতার পা, কারণ সীতা আগুন অপেক্ষা প্রশান্ত, আগুন অপেক্ষা সতী। মানুষেরও যত প্রশান্তি মুখে অথচ দুপুর থেকে মাথাব্যথা এমন। এই দুচোখ আমি আগুনে দিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকি, পরীক্ষা শব্দটি আমি মহাকালের ওপর ছেড়ে দিয়ে দেখেছি, আমরা বড়বেশি মহাকালনির্ভর। আজও যখন তর্জনীর নির্দেশে যজ্ঞ জ্বলে ওঠে আর কেঁপে যায় কদম গাছ তখন আমি মহাকালকেই সতর্ক করি।

১৪ আশ্বিন ১৪১৫
২ অক্টোবর ২০০৮



যে-কপাল পুড়ে গেছে, তার জন্য ভোরবেলাই সাব্যস্ত রেখেছ মৃত্যু? ভোরবেলাই মৃত্যুর প্রকৃত শাদা মুখ? এই মৃত্যুর ত্বক পুড়ে গেছে, আর হাত-পা ফেটে ঢুকে পড়েছে শীত। শীতও চোখে লিখে রেখেছে বৃক্ষের অক্ষর। আমার পা কতবার এই সাজানো অক্ষরের ভেতর দিয়ে হেঁটেছে। দেখেছি বৃক্ষের চোখ ঘর-সংসারের পিপাসায় জ্বলছে। আমিও চোখে লাগিয়েছি পাখিদের লোভ, পাখিদের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার অধিকার রাখো তুমি? ঘরসংসারের জন্য আমিও সবুজ হয়েছিলাম- কান্নার ওপর আমার অভিযোগ নেই। কান্নাতো প্রাচীন অক্ষর, কে তাকে বেঁধে দিয়েছে চোখের ঘর? সারারাত জ্বলে নিভে যাওয়া মোমের ঘ্রাণ যে-বৃক্ষের গায়ে, কত পরমায়ু জমা রেখেছ তার কাছে? তোমার অবিশ্বাসে যখন পা কেটে যায় তোমারই, সান্ত্বনা কি জমা রাখোনি? এখন বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার শব্দে টের পাই বিষন্নতা। আমার মানতের মতো তোমারও সাত কোটি দেবতায় বিশ্বাস? সিঁদুর মেখে মেখে ভোর কি ধুয়ে দিতে পারে পাপগ্রস্ত কপাল!

১৫ আশ্বিন ১৪১৫
৩ অক্টোবর ২০০৮


১০
কীভাবে যে বেঁচে আছি, ডালিম গাছ শরীরের গন্ধ শুকছে। তবে কি বেঁচে নেই? জাগতিক ব্যাপারগুলো মানুষই ভালো বোঝে। আমার ছায়া হারিয়ে গেছে জন্মের মতো। তাই মানুষের মতো হলেও আমার কিন্তু গ্রহণ নেই। ইতিহাসের ছায়া পৃথিবীর মতোই কতবার গ্রহণ হয়েছে। পথের ছায়া আছে যেমন আছে নদীর, খুব দরকার তাই নিজের ছায়া খুঁজতে বেরিয়েছি।

তুমি বলির কথা বলেছ, বিশ্বাস করো খুব ভয় পাই। কত কষ্ট করে রক্ত সহ্য করি, কত সূর্যোদয় কত সূর্যাস্ত ডুবে যায় এই দেহে। শীতের রং নেই বলে রংধনু উঠল না বলে আমার ওপর গ্রহণ পড়ল না তো? অন্ধকার হলাম না আমি। ব্রহ্ম অহংকার চূর্ণ করেছিল যেভাবে, অগ্নির সামনে সামান্য তৃণমাত্র রেখে, পোড়াতে পারেনি। আমি কিন্তু অতি সহজেই পুড়ে গেছি, আমার ছায়াও পুড়ে গেছে বারবার। ডালিমগাছ আমার শরীর শুকছে, ছায়া পায়নি বলে ডালিম গাছের কাছে আমি মিথ্যে মানুষ!

৬ শ্রাবণ ১৪১৫
২২ জুলাই ২০০৮

*
সোর্সঃ কীর্তিকলাপ ওয়েবম্যাগ