বার্নিং
তোমার শোচনীয় পরাজয় কেউ জানতে পারল নাএ এক ভিন্ন রেসিপি
হৃদয় কেটে কেটে কড়াইয়ে সাঁতলানো
মরিচের শীর্ষদেশ বিহ্বল তাকিয়ে
ক্রন্দনশীল বৃক্ষ ও বিড়ালেরা
একে একে সব খসে পড়ছে
মিউকাস, প্লাজমা মেমব্রেন
সৌরঝড় সৌড়ঝড়
সসপেনে ফুটছে জোড়াচোখ
একিলিসের গোড়ালি
একটা পথ শুধু চলে গেছে পপিফুলের
১.
একটা পথ শুধু চলে গেছে পপিফুলের
একটা ত্রিভুজ আয়না
বাঁকা চাঁদ
চোখদুটো বন্ধ, হাত দিগন্তে প্রসারিত
শত শত প্রজাপতি
শত শত ঘাসফড়িং
বৃষ্টির পরের মাঠে
তরঙ্গায়িত জল
সময় বয়ে যাচ্ছে
তোমরাও বয়ে যাচ্ছো সময়ের বিপরীতে
২.
পেছন থেকে দেখা।
দৌড়ে একটা বাস চার চাকার। পাশের সিটে বরাহনগরের ছেলে। কী এক ধ্যানে মগ্ন। তোমার হাত জুড়ে সুগন্ধি ফুল। এই ঘরটা তোমাদের। এখানে নক্ষত্র পা ধুইয়ে দিচ্ছে। বৃষ্টির জল তৃষ্ণা মেটায় মৃত্তিকার। একে অন্যকে ছুঁয়ে আছো, দেয়ালে বাইজেন্টিয়ান গুহাচিত্র। একটা তাজা বাইসন ছুটতে শুরু করল। একটা পথহারা হরিণী। ত্রিশুলে গাঁথবার আগেই গেঁথে নিলো পরস্পরকে। একটাই শুধু পথ চলে গেছে পপি ফুলের। একটাই শুধু তান বাজছে নৈঃশব্দ্যের।
রাত এখন শেষের দিকে
ভোর হতে এখনও অনেক দেরিএসির ঠাণ্ডা বাতাস ঘরটাকে ভরিয়ে তুলেছে
এপাশ হতে ওপাশ
ওপাশ হতে এপাশ
সেকে- পরিণত হয়েছে ঘণ্টায়
দূরে সারমেয়র চিৎকার
ঘরের দরজা খুললেই পথ
রিকশা, গাড়ি, মানুষ
তুমি দরজা খুলতে পারছো না
রাত এখন শেষের দিকে
ভোর তোমাকে ডাকছে
তুমি তবু দরজা খুলতে পারছো না
তুমি এক হ্যালিলুইয়া হ্যালিলুইয়া
একজন পোড়া নারী
একজন পোড়া যুবক
তুমিও না তোমার মতো আরেকজনও নাকেউ আজ কথা বলছে না
সকলেই মুখ গুঁজে খেয়ে চলেছে ক্লিয়ার স্যুপ,
আস্ত আস্ত গলদা চিংড়ি, সবুজাভ লেটুস
একজন পোড়া মানুষ শুধু চিৎকার করছে
ওখানে অনেক কিউপিড
একটা আমার জন্য রেখো
লালনের ছেঁউড়িয়াতে নকল সাধুরা আজ
তারা সব কল্কে ওড়াচ্ছে
একজন পোড়া যুবক শুধু চুপ করে আছে
সকলেই কথা বলছে তারস্বরে
একজন পোড়া নারী শুধু দাঁড়িয়ে আছে
সিংহদরজা বরাবর।
খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি
”কাদম্বরী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই”আর এখানে অসংখ্য চোরকাঁটা পায়ে বিঁধে আছে
শেয়াকূল, লেমন গ্রাস প্রানত্মরে ছড়ানো
নিঃশব্দ রাত্রি
ফাঁকা ট্রেন লাইন
তুমি জেনে গেছো
মানুষ বেঁচে থেকেও মরে যায়
কারো কারো মৃত্যু হয় শেষ রাতে ঘুম ভাঙার একটু আগে
বুক থেকে খসে পড়ে অজানা তারারা
তুমি একটা তারা হতে চেয়েছিলে
একটা জেলে নৌকা বয়ে যাচ্ছে আঁড়িয়াল খাঁর পশ্চিম তীরে
একটা লাল পাঞ্জাবি কিনেছিলে
আজ তাকে দেবার প্রয়োজন অনুপস্থিত
সম্পর্কের মৃত্যু মানে তো মানুষের মৃত্যু
একজন মানুষ মরে যায় অন্যজনের মনে
রাত ধীরে বাড়ে
ঝিঁঝিঁর একটানা মারণসঙ্গীত
গোপন নির্বেদ
রাত ঘন হয়ে এলে দরজায় এসে কড়া নাড়েনা কেউপিনপতন নিস্তব্ধতায় মগজে গোপন শ্লাঘা এসে জমে,
বুদবুদের ফেনা হয়ে মিশে থাকে গোপন নির্বেদ,
চোখ খুলে ঘুমায় সে ডিভানের কোণে
সারারাত ছটফট, কে যেন রক্তে মিশিয়ে দিয়েছে জ্বলন্ত কয়লা
তার আঁচে পুড়তে পুড়তে চকিতে হায়েনার হাসি-
দূর থেকে ভেসে আসা সন্তদের সুর
নিঃশব্দে কেটে নেয় চোখের ঘুম,
ছায়ার মতো চলে ফেরে-
ঝুপ করে মিলিয়ে যায় পশ্চিমা বাতাসে
রাতের সিম্ফনি ঘন রাত হয়ে আসে।
ইস্পাতের তৈরি কথা
তোমার সাথে কথা বলার কথা ছিলআছে তা এখনও মনে মনে,
মানে সে কথা -চাতকীর অধীরতা;
জেগে ওঠে তীব্র তুষারপাতের পর,
নিশ্ছিদ্র রাতের নীরবতায়-
লোকালয় যখন ঘুমিয়ে
একটা আর্তচিৎকারের মতো সে কথা
জিহবায় এসে আটকে গেল;
মানে তা শোনার কথা ছিল যার
সে গেল বধির হয়ে-
একেবারে জন্মের মতো,
নির্বিকার চেয়ে থাকে
চোখে ভাষাহীন অভিব্যক্তি
জানিনা বধিরতা কতদূর তার-
সে কি পৌঁছে গেল বোধিদশায়,
নির্বাণকাল সমাসন্ন?
আর সে কথা আটকা পড়ল মুখবিবরে-
জমে জমে ইস্পাতের ধার।
ইস্পাতের তৈরি সে কথা কেটে ফেলল
নিজের কথাকেই।
রাতের সিম্ফনি
১.দৃশ্যগুলো বদলে যাচ্ছে
একটার পর একটা টয়োটা গাড়ি,
জি করোলার মসৃণতা মিলিয়ে যেতেই
গাল থেকে ঝুলেপড়া মাংসপিন্ড
আধহাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে,
চোখাচোখি হতেই চোখ সরিয়ে নাও তুমি
আঠারো শতকীয় নাগরিক ছাপ চোখে-মুখে।
নির্মমতা নয় সকালের একরাশ অধৈর্য্য
তিরতির কাঁপতে থাকে ভলভোর জানালায়
তুমিও চোখ বুজে ট্রেনের স্লিপার
দ্রুত পার হও মাঝরাতে।
২.
পথটা ভাঙাচোরা
এবড়ো থেবড়ো গলি-ঘুপচি
কে কোন্ গলিতে সটকে পড়েছে,
অপেরা হাউজের নীল আলোয়
হ্যাভ এ স্পেশাল ডে!
৩.
তুমি বেশ কষ্ট পাচ্ছো
তবু বদলে যাওয়া হাতের আঙুল ছুঁয়ে আছো
আর তার রুক্ষ্মতায় নয়
সিমপ্যাথেটিক সিনড্রোমে
গুলে খেয়েছ ক্যালেন্ডারের একটা বছর।
৪.
পুরানো যতটুকু নতুনও ততটুকু
তোমার চোখই বলে দিচ্ছে
ভায়োলিনের একাঙ্কিকার কথা
৫.
চারপাশে যেমন সব মানুষ, কথা হচ্ছে
তুমিও তার সাথে সায় দিচ্ছো,
মাছের পেটিটা কেটে দুটুকরো করছো
তারই মাঝে সর্সর্ শব্দে চলে যাচ্ছে
কালো একটা গুঁইসাপ…….
৬.
দুজনেই কথা বলছে, হাসছেও মাঝে মাঝে
গলায় মোলায়েম ধ্বনি
ঝুম বৃষ্টি, বৃষ্টিতে ভিজছে
রায়েরবাজারের কৃষ্ণাভ মেয়ে-
আর কে তার হাতে সুঁই ফুঁটাচ্ছে?
সূত্রাপুরের বোহেমিয়ান ছেলে!
৭.
রোজ রাতে ওষুধ গোলাচ্ছ
লেমনে বা সোডাতে
পান করছে অন্যরা আর
তোমার কঙ্কালজুড়ে কালশিটার দাগ!
৮.
প্রচলিত নিয়মে যা যা বলা হয়-
তাই বললে তুমি
সেখানে না ছিলে তুমি
আর না ছিলাম আমি।
৯.
প্যারানয়েড সিনড্রোম বাসা বেঁধেছে মনে
সারারাত ছাদে পায়চারি
একটা গোলাপি আলো কি দেখা যাচ্ছে
টানেলের কিনার ঘেঁষে-
১০.
এরপর যা কিছু থাকবে সব ভালো আর সুন্দর-
এমন ক্লিশে শব্দ, বাক্য
কবিতায়তো লেখোনা!
১১.
প্রখর রোদে ডানা মেলছে সারসেরা
তোমার নিরুত্তাপ চোখেও কি ফুটে উঠল
শিল্পীর অপ্রেম!
১২.
মর্টারের শব্দ শুনছি
করোটি ভেদ করে চলে গেল
ঝাঁকে ঝাঁকে বুলেট
টেরই পেলাম না তোমার অগত্যাযাত্রা…
১৩.
ট্রেন চলছে শর্ষে খেত,
ট্রেন চলছে বালুর স্তুপ
দ্বিখণ্ডিত শিরিষের ডানা
প্রিয়তম নাম এডোনিস
প্রিয়তম নাম ওসিরিস।
দু’জন
সেখানে ছিলাম শুধু আমরা দু’জন। তুমি আর
আমি। গোলাপি আভামাখা ছাদের দেয়ালে কোথা থেকে উড়তে উড়তে এসে বসলাম নিভু নিভু
সন্ধ্যায়। ধূসর চেয়ারগুলো বহুদিন অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল,
যেন আমাদেরই জন্য। ধুলো জমেছিল হাতলের আড়ালে। আর আমাদের পাখনায় গোঁজা ছিল
অপরিচয়ের দ্বন্দ্ব। তবু খুব বেশি অপরিচিত আমরা ছিলাম না। কথা বলবার মতো
সম্পর্কটুকু ছিল দুজনের। হয়তো তার চেয়েও কম কিন্তু সেই রাতে, ঝড়ো বাতাসে পথ
চলতে কোনো দ্বিধা এসে গ্রাস করেনি আমাদের। দুজন মানুষ যেমন যেমন করে জড়িয়ে
পড়ে আমরাও তেমনি সহজ নিয়মে করে চললাম সরল অঙ্ক। না সূত্রে কোনো ভুল ছিল
না। অভিযোজনিক সম্ভাবনায় পূর্ণ ছিল রাতের বাতাস। তবু কোথায় যেন ভীষণ
উন্মনতা রয়ে গেল। পাকা শিকারিরও মাঝে মধ্যে হাত ফসকে যায়। এ যেন বৃন্তচ্যুত
পারিজাত। মধ্যমায় এসে আটকে গেল পথের গতি। তাতে অবশ্য খুব বেশি ক্ষতি হল
না। লাভও নয়। শূন্য করতল ভরে উঠল না ফলন- বৃক্ষে। তবু উষ্ণতর সেই রাতটুকু,
তার নির্যাস- এখনও ঝরে পড়ছে পথের ধুলোয়।
২.
পথে চলতে চলতেই দেখা। কোনোরকম ভণিতা ছাড়াই পরস্পর কথা বলতে শুরু করল যেন বহু দিনের চেনা। কোনো সঙ্কোচ এসে দু’জনকে জাপটে ধরল না। তপ্ত গরমের দিনে পরস্পরের প্রতি তারা কোনো ক্রোধ প্রকাশ করল না, আনন্দও নয়। দুর্গম গিরি পথে শীতল জল যেমন করে বয়ে যায় তেমনি স্বাভাবিকতায় বয়ে চলল দীর্ঘ পথ। এসময় তাদের মধ্যে কোনো আকর্ষণ এসে ভর করল না, বিকর্ষণও নয়। বহুশত বছর বয়ে চলল গাঙ্গেয় ভূমিখণ্ডে, সেখান থেকে ভারতীয় মহাসাগর পারি দিয়ে মালাবার দ্বীপপুঞ্জে। আরও আরও দূরে যেতে থাকল দু’জন, তাদের শরীরে গোঁজা পাখনায় ভর দিয়ে ভেসে চলল বাঁধাবন্ধনহীন।
একদিন খুব ঝড় হলে ডানা ভেঙে কাদায় আছড়ে পড়ল একজন আর অন্যজন তখনও উড়ে চলল আকাশে। শক্ত ডানায় ভর দিয়ে ভেসে চলল শূন্যে যতক্ষণ পর্যন- না তার ডানা দুটো ভেঙে মুচড়ে গেল।
পথে চলতে চলতেই দেখা। কোনোরকম ভণিতা ছাড়াই পরস্পর কথা বলতে শুরু করল যেন বহু দিনের চেনা। কোনো সঙ্কোচ এসে দু’জনকে জাপটে ধরল না। তপ্ত গরমের দিনে পরস্পরের প্রতি তারা কোনো ক্রোধ প্রকাশ করল না, আনন্দও নয়। দুর্গম গিরি পথে শীতল জল যেমন করে বয়ে যায় তেমনি স্বাভাবিকতায় বয়ে চলল দীর্ঘ পথ। এসময় তাদের মধ্যে কোনো আকর্ষণ এসে ভর করল না, বিকর্ষণও নয়। বহুশত বছর বয়ে চলল গাঙ্গেয় ভূমিখণ্ডে, সেখান থেকে ভারতীয় মহাসাগর পারি দিয়ে মালাবার দ্বীপপুঞ্জে। আরও আরও দূরে যেতে থাকল দু’জন, তাদের শরীরে গোঁজা পাখনায় ভর দিয়ে ভেসে চলল বাঁধাবন্ধনহীন।
একদিন খুব ঝড় হলে ডানা ভেঙে কাদায় আছড়ে পড়ল একজন আর অন্যজন তখনও উড়ে চলল আকাশে। শক্ত ডানায় ভর দিয়ে ভেসে চলল শূন্যে যতক্ষণ পর্যন- না তার ডানা দুটো ভেঙে মুচড়ে গেল।
৩.
অডিটোরিয়ামের পিনপতন নিস্তব্ধতার মধ্যে জাপানি ট্রেইনারের ঝকঝকে দন্ত প্রদর্শন দেখতে দেখতে হাঁপ ধরে এলে মেয়েটির চোখ পড়ল লম্বা গৌর বর্ণ ছেলেটির প্রতি। ছেলেটির চোখও তখন বন্ধ হয়ে আসছিল। সম্ভবত সেও হাঁপিয়ে উঠেছিল পূর্বদেশীয় ভব্যতায়। কতক্ষণ আর মধুবর্ষণ সহ্য করা যায়? কেউ যখন ক্রমাগত হিতোপদেশ দিতেই থাকে একসময় তার আর কোনো অর্থ থাকে না। তেমন একটি ক্ষণেই তাদের দৃষ্টি পরস্পরের প্রতি নিবদ্ধ হল। মেয়েটি ছেলেটির চোখের মধ্যে দেখতে পেল দূর দিগন্তের হাতছানি, যেখানে সোনালি ঈগল বয়ে নিয়ে আসে নতুন শস্যের গন্ধ। আর ছেলেটি মেয়েটির চোখে দেখতে পায় মৃত্যুর চিহ্ন। এভাবেই তাদের উন্মীলন, একে অন্যকে জানা। সবটাই তারা দেখেছে নিজেদের চোখ দিয়ে। আর সেইমতো করে গেছে বিনিময়।
অডিটোরিয়ামের পিনপতন নিস্তব্ধতার মধ্যে জাপানি ট্রেইনারের ঝকঝকে দন্ত প্রদর্শন দেখতে দেখতে হাঁপ ধরে এলে মেয়েটির চোখ পড়ল লম্বা গৌর বর্ণ ছেলেটির প্রতি। ছেলেটির চোখও তখন বন্ধ হয়ে আসছিল। সম্ভবত সেও হাঁপিয়ে উঠেছিল পূর্বদেশীয় ভব্যতায়। কতক্ষণ আর মধুবর্ষণ সহ্য করা যায়? কেউ যখন ক্রমাগত হিতোপদেশ দিতেই থাকে একসময় তার আর কোনো অর্থ থাকে না। তেমন একটি ক্ষণেই তাদের দৃষ্টি পরস্পরের প্রতি নিবদ্ধ হল। মেয়েটি ছেলেটির চোখের মধ্যে দেখতে পেল দূর দিগন্তের হাতছানি, যেখানে সোনালি ঈগল বয়ে নিয়ে আসে নতুন শস্যের গন্ধ। আর ছেলেটি মেয়েটির চোখে দেখতে পায় মৃত্যুর চিহ্ন। এভাবেই তাদের উন্মীলন, একে অন্যকে জানা। সবটাই তারা দেখেছে নিজেদের চোখ দিয়ে। আর সেইমতো করে গেছে বিনিময়।
এভাবে বহু দিন গড়িয়ে চলল। ঈগলের ডানায় ভর করে মেয়েটি পৌঁছে গেল দিগন্তের ঐপারে আর ছেলেটিও বুকে গেঁথে নিল অর্জুনের তীর। কিন্তু তারা কেউই মুক্তি পেল না। নিজেদের চিত্রিত ক্যানভাসে ক্রমাগত একেই চলল, পরস্পরকে দিতে পারল না কিছুই।
*
সোর্সঃ কীর্তিকলাপ ওয়েবম্যাগ